সারারাত্তির, সারারাত্তির
সারারাত্তির জেগেছি দেখেছি
দুই চোখ মেলে জেগেছি দেখেছি
তন্দ্রাবিহীন দুই চোখ মেলে
সারারাত্তির জেগেছি, দেখেছি, জেনেছি ...
কী দেখে কেউ সারারাত্তির জেগে? কী দেখার থাকতে পারে একটা সমস্ত রাত্রি জাগরণের ওপাড়ে? কারা জাগে একটা আস্ত রাত! সাধে জাগে, নাকি তাড়নায় জাগার রাত সেসব? তন্দ্রাবিহীন চোখের নিদারুণ জ্বালা কি শুধু ঘুম না আসার তাগিদে নাকি অন্য কিছুর মিথোস্ক্রিয়ায় সেসব জানতে চাইবার তাগিদ মেটে বাদল সরকার-এর লেখা “সারারাত্তির” নাটকে। তবে পাঠের শব্দ, বাক্য, অনুভব কতখানি নাটকের আদলে অনুরণিত হতে পারে সাধারণ ‘ছা-পোষা’ মানুষের অন্তরে? তাঁর মনের দেওয়াল থেকে দেওয়ালের পরত কতখানি পেরিয়ে শোনা যায় এসব প্রতিধ্বনি? এসব প্রশ্ন আজ নতুন কিছু নয়। বহু দিন বহু চিন্তনের চোরাপথ ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় এই প্রশ্ন। তবু মঞ্চের আলো আঁধারিতে জীবনের অবাধ চলাফেরা যে শব্দে অনাবিল প্রাণ দেয়, অন্তত সাধারণের সহজ বোধকে নাড়িয়ে দেয় জ্যান্ত মানুষের হাসি, কান্না ওঠানামা – এই বিষয়ে কোনও দ্বিমত নেই। শব্দ যেখানে থিতিয়ে যায় সেখানে শরীরী ভাষার দ্বন্দ্ব উঠে আসে জীবনের, যাপনের চিন্তার দলিল হয়ে। কিন্তু এরকম নাটকের মঞ্চায়ন কোথায় পেতাম? তাই লোভী মন যেদিন জেনেছে শান্তিনিকেতনের “দল নাট্যগোষ্ঠী” এমন একটি নাটকের মঞ্চ প্রস্তুত করে ফেলেছে মানুষের মনে পার্মানেন্ট ম্যারাপ বাঁধবে বলে সেদিন আর লোভকে অতিক্রম করে অন্য কোনও সংযমের কথা মাথায় আসেনি…।
“দল” আয়োজিত “নটী বিনোদিনী নাট্য উৎসবে”র ২য় দিনে বিশ্বভারতীর লিপিকা প্রেক্ষাগৃহে মঞ্চস্থ হয়ে গেল বাদল সরকারের এই “সারারাত্তির” নাটকটি। সুললিত মঞ্চ, শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘর সর্বোপরি অজস্র মনোজ্ঞ মানুষ এই নাটকের সহচরী হলেও এ কথা আমি হলফ করে বলতে পারি এমন নাটক দেখবার জন্য মানুষ রাস্তার ধারে লাইন দিয়ে দেখতেও রাজি। মঞ্চ ও আরাম এখানে শুধুমাত্র উপরি পাওনা হয়ে এসেছে। নাটকে সর্বসাকুল্যে তিনটি চরিত্র। এক বৃদ্ধ, এক স্ত্রী ও এক স্বামী। তিনটি চরিত্রই কাকতালীয়ভাবে মঞ্চস্থ করেছেন বিশ্বভারতী পাঠভবনের তিনজন শিক্ষক - শ্রী তড়িৎ রায়চৌধুরী (বৃদ্ধ), শ্রী কুমার বিক্রান্ত বসাক (পুরুষ), শ্রীমতি দেবলীনা দালাল (স্ত্রী)। ফলে, এটুকু বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এঁদের তিন জনেরই নাটক বিষয়ে প্রথাগত কোনও তালিম তেমন নেই। কেউ প্রফেশনাল অ্যাক্টরও নন। তবু সেইদিনের নাট্যসন্ধ্যায় লিপিকায় উপস্থিত প্রত্যেকে নিজেদের ভিতরে এক অদ্ভুত কাঁপুনি টের পেয়েছেন। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম অথচ ভিতরে একটা জ্বরের ভাব। এসি হলের কোনও কেরামতি কিন্তু এখানে কাজ করেনি; কাজ করেছে অভিনেতাদের নাটকের পাতায় ডুব দেওয়া, কাজ করেছে চরিত্রের রক্ত মাংস টেনে টেনে ছিঁড়ে ছিঁড়ে নিজেদের গায়ে হাড়ে মজ্জায় বসানো, কাজ করেছে আলো আঁধারি মঞ্চে মানুষের মনের আলো আঁধারি ঢুকে পড়া এবং কাজ করেছে নির্দেশনার অবর্ণনীয় চৈতন্য ও মুন্সীয়ানা।

নাটকের গল্পে স্ত্রী ও স্বামী একে অপরের সম্বল… সাধারণ জীবনে যেমনটা হয় ঠিক তেমনটা। দাবী, তাঁরা একে অপরের সব জানে, সব চেনে। নিজেদের জীবন একে অপরের সামনে খোলা সাদা পাতার মত। কোনও কালির আঁচড় তাতে অজানা নয়। নেই কোনও চোরা বাঁক। তবু স্ত্রীর কল্পনাপ্রবণ ছেলেমানুষি রুখতে মানে দমিয়ে রাখতে পুরুষের প্রয়োজন একটি সন্তান। তাতে করে স্ত্রীলোককে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলা যায়। অধিকারবোধ! তবু তো সে আমার সব চেনে। সব জানে! জানা, জানার বাইরে চেনা, চেনার বাইরে বোঝা এইসব কিছু বাইরের বৃষ্টি আর কোলাহলের মধ্যে অদ্ভুত ভাবে ঘুরপাক খেতে থাকে। কে কাকে চেনে? কেই বা কাকে জানে? কাউকে পুরোপুরি জেনে ফেলা কি সম্ভব? কেউ কাউকে পুরোটা চিনে ফেললে তারা কি এক আর একসাথে পারে থাকতে? আয়নার সামনে কি সারাদিন থাকা যায় নিদারুণ নগ্ন হয়ে! চেতনা যেন শুধুই এক চেতনা নয়। আসলে সে বিষ। যে বিষ চোখের সাথে মনের এক গভীর সংঘাত তৈরী করে। বাস্তবের মাটিতে পা রাখতে দেয় না অথচ সেটাই আসলে তার চরম বাস্তব… সব জানার পাপ সব ধ্বসিয়ে দেয় এক জীবনে। সব জানতে নেই সব শুনতে নেই। সব জেনে ফেলা মানুষ কখনো ঘর করতে পারে না। ঘর করতে লাগে অভিনয়!!!

অভিনয় নাকি অভ্যাস? নাটকে বৃদ্ধর মুখ থেকে উঠে জীবনের সেই পিছিল কিন্তু অমোঘ সত্য… ‘অতি বড় দুর্যোগেও আমাদের ঘর ভাসে না!’ ঘর তবে কীসে টেকে? প্রেম ভরসা কিছুই না। শুধুই অভ্যাসে? শান্তির অভ্যাস? সুখের অভ্যাস? আনন্দ থাকে অভ্যাসে? থাকে নিজেকে নতুন করে চেনা? আচ্ছা অভ্যাসের ঘরকে কি ঘর বলা যায়? সেকি নয় অভ্যাসের কারাগার? অথবা যদি বলি এই অভ্যাসই আসলে এক ভালোবাসা। জীবনের প্রতি, সুখের প্রতি, শান্তির প্রতি, চেনা শরীরটার প্রতি। শরীর আর মন মিশবেই এমন তো কোনও কথা নেই! আর নেই বলেই মাঝরাতে রঞ্জনের অবাধ বিচরণ স্ত্রীর মনে। যে মনের হদিশ সহজ মনের পুরুষটি রাখে না। হ্যাঁ, আমি তাকে সহজই বলবো। জীবনের সূক্ষ্মতা ছুঁতে না পারা কোনও অপরাধ নয়! কবি হতে না পারা কোনও অপরাধ নয়! সে সহজ ভাবে স্ত্রীর সঙ্গ চায়। সহজ ভাবে তার যা কিছু যুক্তিগ্রাহ্য মনে হয় না তাকে ‘স্ত্রীর পাগলামি’ বলে! সহজ পুরুষের মতোই সে স্ত্রীবুদ্ধিকে ছোট করে দ্যাখে। স্বাভাবিক পুরুষের মতোই ছেলেমানুষ মনে করা এক অস্বাভাবিক স্ত্রীকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখে ভালোবাসতে চায়। তার কোনও দোষ নেই। তার মধ্যে জীবনের সহজ সাধারণ বোধ আর ভালোবাসা টলটলে জলের মত প্রবাহিত। তার মতোই সুমিষ্ট তাঁর চাওয়া। তবু নাটকের প্রান্ত দেশে দাঁড়িয়ে মনে হয় এই পুরুষ, এই স্বামী বড় অসহায়। সে স্বভাবে স্থূল কিন্তু প্রেমিক। এই তাঁর দোষ। তাঁর দোষ তাঁর চেতনা যথেষ্ট সজাগ নয় তাঁর স্ত্রীর মন ছুঁয়ে যাবার জন্য।

অপরদিকে যে রঞ্জন একজন নারীর চেতনা বুদ্ধি প্রাণ সবটুকু নিংড়ে ভালোবাসা চায়, যে চায় নারীর একমুখী সর্বাত্মক ভালোবাসা সেই ভালোবাসাকেই সেই ধ্বংসকেই গলায় মালা দেবার জন্য প্রস্তুত স্ত্রীলোকের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম চেতনা। হায় স্ত্রীলোক! অথচ যে একবার তাকে পুরোপুরি চিনে নিলো অথবা যাকে পুরোপুরি চেনা হয়ে গেলো সে যে অবিলম্বেই হয়ে উঠবে গলার ফাঁস, চেনার দাবী পাল্টে যাবে রোজ রোজ, চৈতন্য বিষ ঢেলে দেবে স্বপ্নের চোখে সেই বোধ আসেনি মাথামোটা এই স্ত্রীলোকের আশেপাশে কোথাও? আবার ঘুরেফিরে আসে সেই একই প্রশ্ন। যে সবটা জেনে যায় তাকে কি আর পাশে রাখা যায়? চাওয়া যায় অনন্তকাল একই ভাবে?

উত্তর আমি দেবো না। দেবে মঞ্চের কলাকুশলিরা। আসি চরিত্রদের প্রসঙ্গে। বৃদ্ধর উপস্থিতি বয়স ও চিন্তার জাল নাটকের পাতা থেকে মনের খাতায় উৎরাতে যতটা পথ লাগে সেই পথের প্রতিটি কণায় আলো ছড়িয়েছেন শ্রী তড়িৎ রায়চৌধুরী মহাশয়। তার অভিনয়ে সাধারণ গৃহস্থর ছাপ ধীরে ধীরে উত্তীর্ণ হয়েছে যক্ষপুরীর সেই যক্ষের শরীরী স্থবিরতায়। সাধারণ চোখের হাসি হঠাৎ করেই যখন বদলে যায় তার চেতনার তার জাগরণের হিসহিসানিতে তখন বাস্তবিক কপালে জড়ো হয় এক জন্মের আর্ত স্বেদবিন্দু। পুরুষের চরিত্রে কুমার বিক্রান্ত বসাক এক অদ্ভুত অসহায় মানুষকে তুলে ধরেছেন সবার সামনে। তার চাওয়া, তার নিজেকে টিকিয়ে রাখতে চাওয়া, তার অসহায়তা এবং চোখের সামনে তাসের ঘরকে মুঠো করে করে জড়ো করতে চাওয়া এই সবটা এই সব আকুতি ফুটে উঠেছে তার সমস্ত শরীরের ভাষায়। তার চোখের আকুলতায়। নারী, অনন্ত নারীমন স্বামীর নিশ্ছিদ্র নিরাপদ আরামের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে কখন আসে, কেন আসে, কোন তাড়নায় আসে… কোন মোহমায়ায় তার সমস্ত রাত্রি জাগরণ এসে মেশে এই বৃদ্ধর অবিন্যস্ত ঘর অথবা মনের চোরাকুঠুরিতে তা প্রকাশের জন্য যে অনন্য আবেদন ও অসহায়তার ভাষার প্রয়োজন ছিলো তার সবটুকু নিংড়ে দিয়েছে শ্রীমতি দেবলীনা দালাল মহাশয়া। আর আমরা? দর্শকরা? শুধু চমকে চমকে উঠেছি জীবনের এই নগ্ন নিষ্ঠুর আঘাতে প্রত্যাঘাতে। সত্যের প্রতি অসহনীয় যন্ত্রণা আমাদের ভিতরটাকে ফালা ফালা করে রেখেছে। আমাদেরও কি তবে রাত্তির জাগরণ হয়?
সারারাত্তির, সারারাত্তির…
জেগে থাকা চোখ, মেলে রাখা চোখ
ঘুমের বিরামে বঞ্চিত চোখ
জ্বালা ধরা দুটো নির্মম চোখ
স্বপ্ন কোমল ধবল অঙ্গে
দৃষ্টি কঠিন চাবুকের দাগ পেতেছে।
নির্বাক শ্রোতা প্রশ্ন করেছে তবু কি তোমায় সেভাবে চিনতে পেরেছে!

“দল নাট্যগোষ্ঠী”কে শুধু সাধুবাদ নয় জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা। নির্দেশেক বিভাস বিষ্ণু চৌধুরীর প্রতি নমস্কার। যেখানে সুযোগ পাবেন একবার এই নাটকের স্বাদ সম্ভব হলে গ্রহণ করবেন। যেমন আমি করতে চাই, শুধু একবার নয় আরও কত বার, আরও কতবার স্বপ্নে তোমায় দেখতে চাই ...।